Header Ads

Header ADS

একটি মফস্বলের হাসপাতাল || অনুগল্প || মিন্টু ভদ্র

একটি ব্যস্ত রাস্তার এক প্রান্তে কয়েকটি ঔষুধের দোকান, একটি টং চাঘর এবং অপর প্রান্তে ছিমছাম একটি হাসপাতাল। উদাস গৃষ্মের দুপুরেও মফস্বলের এ হাসপাতাল মানুষে গিজগিজ করছে। মানুষ আসছে, যাচ্ছে... শতশত মানুষ। দৌড়াচ্ছে রোগীর স্বজন। কাউন্টারের পাওনা মেটাতে বেশ ভিড়, লাইন পড়েছে ডাক্তারের রুমের সামনেও। একজন খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ডাক্তারের রুমে। হুইল চেয়ারে মাথা নত করে বসে আছে বৃদ্ধা মা। পুত্রের কাঁধে ভর করে উঠে দাড়াতে আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ পিতা, সেই পুত্রের কোলে চড়ে দিব্যি চলে গেল গন্তব্যে। দুইজন মধ্যবয়সী মহিলা ও একজন পুরুষ এবং একজন বৃদ্ধা মুখোমুখি বসে টিফিন ক্যারিয়ারে থাকা রুটি ভাগ-বাটোয়ারা করে খাচ্ছে।  একটি বছর চারেকের বাচ্চা ওদের খাওয়া মনোযোগ দিয়ে অবলোকন করছে। ডাক্তারের চেম্বারের দরজার পাশে একটি খাতা সামনে বসে আছে ডাক্তারের সাহায্যকারী মেয়েটি। হাসপাতালে বসে বসে তাঁর নতুন দৌড়াতে শেখা শিশুর সাথে খেলছে একজন মা। ক্লান্তির ছাপ সমস্ত মুখজুড়ে, মনে হচ্ছে হাজার বছর অসুস্থ থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। রোগ-শোক তাঁর কাছে কোন ব্যাপারই না। তাঁর হাতে থাকা সরু একটি পাইপে ফু দিয়ে শিশুটির টাকমাথায় হাওয়ার সুড়সুড়ি দিচ্ছে আর বাচ্চাটি হেসে কুটুকুটি হচ্ছে। সেটা দেখে মায়ের সে কী আনন্দ! মা-টি এই আনন্দ বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে নয়তো এই আনন্দ আরও কিছু সময় ধরে রাখতে, আবারও ফু দিচ্ছে, বারবার ফু দিচ্ছে। ছেলেটি ঘোড়ার মত চিঁহি চিঁহি করে চেঁচিয়ে উঠছে মধ্যেমাঝেই। সে চিৎকারে অন্যদের কিঞ্চিত অসহ্য হলেও, মায়ের অমূল্য প্রাপ্তির প্রশান্তি দুই চোখে। সে এক দেখার মতো দৃশ্য। হঠাৎ একজন পুরুষ এগিয়ে এলো ওদের দিকে, ছেলেটি "বাবা-বাবা-বাবা" করে ঝাপ দিতে চাইলে, মা নিবৃত্ত করে কোলে তুলে নিল। লোকটি, মহিলাটির চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু বাক্যালাপ করে কোথাও একটা চলে গেলো। বাবার চলে যাওয়া দেখে, শিশুটি প্রতিবাদী ভাঙ্গিতে চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আশেপাশের মানুষগুলো অস্বস্তিকর চোখে শাসাচ্ছে ওদের। যেন কান্না এখনই না থামালে ট্রাম্প-পুতিন চুক্তি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। অগত্যা শিশুর কান্না থামাতে স্বল্প বয়সী এই আনাড়ী মা-ও মোক্ষম অস্ত্র, অব্যর্থ অস্ত্র স্তন্যপান করাতে প্রবৃত্ত হলো।
পেছন থেকে বাবা পিঠে হাত দিয়ে বলল সম্ভবত রিপোর্টগুলো এসে গেছে, ডাক্তার চলে যাবে না কি বলছে, খোঁজ নে তো। পিতৃ আজ্ঞা বলে কথা!  আমি সে কাজেই ব্যস্ত।

কাজ শেষ। হঠাৎ খেয়াল করলাম, কয়েকজন লিফ্ট থেকে নেমে জিজ্ঞেস করলো - প্যাথলজীটা কোন দিকে? উত্তর না দিয়ে একজন ইউনিফর্ম পরা লোক ডাক দিলো-- এখানে ভানুমতি কে? ভানুমতি আছেন? কেউ একজন বললেন - এইতো আমি। প্যাথলজিটা দেখিয়ে দিয়ে আবারও ডাকলেন - জাহানারা? এখানে জাহানারা কে?
কোন উত্তর আসলো না। ডাক্তারের জন্য অপেক্ষারত ফ্লোর ভর্তি চেয়ারে বসা এবং দাড়িয়ে থাকা মানুষ একে অন্যের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো। আবার ডাকলো - জাহানারা কে? এবারও উত্তর কোন আসলো না। আবার ডাকলো - জাহানারা আছেন? হঠাৎ কোলাহল থেমে গেল। এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সময়। সকলের দৃষ্টি উত্তর-পূর্বের সবশেষে কর্ণারের চেয়ারটার দিকে। একজন মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে, মাথা সর্বোচ্চ ঝুকিয়ে স্থির হয়ে আছে। চুলের খোপায় জড়িয়ে আছে সবুজ শাড়ির আঁচল। পাশে বসা একজন গায়ে ধাক্কা দিয়ে ডাকলেন - এই যে শুনছেন? কোন উত্তর আসলো না, নির্বিকার ঝুঁকে রইলো। আবার জোরে ধাক্কা দিলে, কাত হয়ে পড়ে যেতে গেলে ধরে ফেললেন। কোলের বাচ্চাটি কোলেই ধরা রইলো। বাচ্চাটি দুগ্ধপান করছিল একটু আগেও। সেটা উপস্থিতির সামনে আর গোপন রইলো না। শিশুটিকে ঘুম পাড়িয়ে, মা ঘুমিয়ে পড়লেন চিরতরে, ফাঁকি দিলেন জন্মের মত।

আমি খেয়াল করলাম, ঐ দিকটাতে আর তাকাতে পারছি না। চোখ জ্বলে যাচ্ছে আমার। ক্রমেই ভিড় বাড়ছে। সময়ের বড্ড অভাব, আমাদেরও চলে যেতে হবে। শুধুমাত্র একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে, "আহারে" বলে, আমি আর আমার বাবা হাসপাতাল ত্যাগ করলাম।

একটি মফস্বলের হাসপাতাল || অনুগল্প || মিন্টু ভদ্র
২৯/০৭/২০১৮

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.