Header Ads

Header ADS

ভালোবাসা সম্বন্ধে --স্বামী বিবেকানন্দ

যখনই মানুষের কোন বিষয়ে তীব্র আসক্তি হয়, তখনই সে নিজেকে হারাইয়া ফেলে, সে আর আপনি আপনার প্রভু থাকে না, সে দাস হইয়া যায়। যদি কোন রমণী কোন পুরুষের প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত হয়, তবে সেই পুরুষের দাসী হইয়া পড়ে। পুরুষও তদ্রুপ রমণীর প্রতি আসক্ত হইলে তাহার দাসবৎ হইয়া যায়। কিন্তু দাস হইবার তো কোন প্রয়োজন নাই।
যে ভালোবাসা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ, তাহাই একমাত্র প্রেম-শব্দবাচ্য। সকল রমণীই বলিয়া থাকে তাহারা ভালোবাসে, কিন্তু তাহারা শীঘ্রই বেশ বুঝিতে পারে, তাহারা ভালোবাসিতে অক্ষম। সংসারে ভালোবাসার কথা খুব শুনা যায়, কিন্তু ভালোবাসা বড় কঠিন। কোথায় ভালোবাসা! ভালোবাসা যে আছে, তাহা কিরুপে জানিবে! ভালোবাসার প্রধান লক্ষণ, উহাতে কেনা-বেচা নাই। এক ব্যক্তি যখন অপরকে তাহার নিকট হইতে কিছু পাইবার জন্য ভালোবাসে,  জানিবেন সে ভালোবাসা নহে, দোকানদারী। যেখানে কেনা-বেচার কথা, সেখানে প্রেম নাই। প্রেম চিরকাল দানই করে, সে চিরকালই দাতা----গ্রহীতা কোন কালেই নহে।
প্রেমের দ্বিতীয় লক্ষণ, প্রেমে কোনরুপ ভয় নাই। কাহাকেও ভয় দেখাইয়া কি ভালোবাসানো যায়? ভালোবাসা থাকিলে কখনো ভয়ের ভাব থাকিতে পারে না। একজন বিচারপতির কথা ধরুন --- তিনি যখন কার্যাবসানে গৃহে আসেন, তখন তাহার পত্নী তাঁহাকে কিভাবে দেখিয়া থাকেন? তিনি তাঁহাকে তাঁহার স্বামী বলিয়া, তাঁহার প্রেমাস্পদ বলিয়াই দেখিয়া থাকেন।
প্রেমের তৃতীয় লক্ষণ ইহা অপেক্ষাও উচ্চতর। প্রেম সর্বদাই উচ্চতম আদর্শস্বরুপ। যখন মানুষ এই দুই সোপান অতিক্রম করিয়া যায়, তখন সে দোকানদারী ও ভয়ের ভাব ত্যাগ করে, তখন সে বুঝিতে পারে, প্রেমই সর্বদা আমাদের উচ্চতম আদর্শ।
প্রেমিকের আর দ্বিতীয় ভালোবাসার পাত্র নাই, কারণ উহাই প্রেমের সর্বোচ্চ আদর্শ। যতদিন না আমাদের ভালোবাসার পাত্র আমাদের সর্বোচ্চ আদর্শ হইয়া দাঁড়ায়, ততদিন প্রকৃত প্রেম আসিতে পারে না। হইতে পারে অনেকস্থলে মানুষের প্রেম মন্দ দিকে প্রযুক্ত হয়, কিন্তু প্রেমিক লোকের পক্ষে তাহার প্রিয় বস্তুই তাহার সর্বোচ্চ আদর্শ। কোন ব্যক্তি অতি কুৎসিত লোকের ভিতর আপনার উচ্চ আদর্শ দেখিতে পায়, আবার উপরে উহা খুব ভাল লোক দেখিতে পায়; কিন্তু সকল স্থলে আদর্শটিকেই কেবল প্রকৃত গভীররুপে আমরা ভালোবাসিয়া থাকি।
আমরা এই জগতে দেখিতে পাই যে, পরমা সুন্দরী রমণী অতি কুৎসিত পুরুষকে ভালোবাসিতেছে। আবার ইহাও দেখিতে পাই যে, পরম সুন্দর পুরুষ কুৎসিতা রমণীকে ভালোবাসিতেছে। তাহারা কিসে আকৃষ্ট হইতেছে? বাহিরের লোকে সেই স্ত্রী বা পুরুষকে কুৎসিত বলিয়াই দেখিবে, কিন্তু প্রেমিক তাহা কখনো দেখিবে না। প্রেমিকের চক্ষে প্রেমাস্পদের তুল্য পরম সুন্দর আর কেহ নাই। ইহা কিরুপে হয়? যে রমণী কুৎসিত পুরুষকে ভালোবাসিতেছে, সে যেন তাহার নিজ মনের অভ্যন্তরবর্তী সৌন্দর্যের আদর্শ লইয়াই ঐ কুৎসিত পুরুষের উপর প্রক্ষেপ করিতেছে, আর সে যে সেই কুৎসিত পুরুষকে পূজা করিতেছে ও ভালোবাসিতেছে তাহা নহে, সে তাহার নিজের আদর্শের পূজা করিতেছে।
"কেহই পতির জন্য পতিকে ভালোবাসে না, পতির অভ্যন্তরে যে আত্মা রহিয়াছেন, তাহার জন্যই লোকে পতিকে ভালোবাসে; পত্নীর জন্য কেহ পত্নীকে ভালোবাসে না, পত্নীর অভ্যন্তরে যে আত্মা রহিয়াছেন, তাহার জন্যই লোকে পত্নীকে ভালোবাসে; কেহই সেই সেই বস্তুর জন্য সেই সেই বস্তুকে ভালোবাসে না, আত্মার জন্যই সেই সেই বস্তুকে ভালোবাসিয়া থাকে"। এমন কি এই স্বার্থপরতা, যাহাকে লোকে এত নিন্দা করিয়া থাকে, তাহাও সেই প্রেমেরই এক প্রকাশ মাত্র। ঘোর স্বার্থপরতার মধ্যেও দেখা যায়, ঐ 'স্ব' এর, 'অহং'-এর ক্রমশঃ বিস্তৃতি ঘটিতেছে। সেই এক অহং-লোক বিবাহিত হইলে দুইটা হইল, ছেলেপুলে হইলে অনেকগুলি হইল---এইরুপে তাহার আত্মস্বরুপ হইয়া যায়। উহা ক্রমশঃ বর্ধিত হইয়া সার্বজনীন প্রেম অনন্ত প্রেমে পরিণত হয়, আর সেই প্রেমই ঈশ্বর।
মহাশক্তি আমাদের পশ্চাদ্দেশ হইতে আমাদিগকে ভালোবাসিবার জন্য প্রেরণা দিতেছেন--আমরা জানি না কোথায় সেই প্রেমাস্পদকে খুঁজিব, কিন্তু এই প্রেমই আমাদিগকে উহার অনুসন্ধানে সম্মুখে অগ্রসর করিয়া দিতেছে।
মানবীয় প্রেমের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষের প্রেমই সর্বোচ্চ, স্পষ্টাভিব্যক্ত, প্রবল ও মনোহর। স্ত্রী পুরুষের এই প্রমত্ত ভালোবাসা সাধু-মহাপুষগণের প্রেমোন্মাদেরই ক্ষীণতম প্রতিধ্বনি মাত্র।
শাস্ত্র বলেন, জগতে একমাত্র আকর্ষণীয় শক্তি রহিয়াছেন---সেই আকর্ষণী শক্তি ঈশ্বর! পতির পরম অনুরাগী রমণী জানে না যে, তাহার পতির মধ্যে যে মহা-আকর্ষণী শক্তি রহিয়াছে, তাহাই তাহাকে তাহার স্বামীর দিকে টানিতেছে। তখনই মানুষ যথার্থ ভালোবাসিতে পারে, যখন সে দেখিতে পায়, তাহার ভালোবাসার পাত্র কোন মর্ত জীব নহে। তখনই মানুষ যথার্থ ভালোবাসিতে পারে, যখন সে দেখিতে পায়, তাহার ভালোবাসার পাত্র খানিকটা মৃৎখণ্ড নহে, স্বয়ং ভগবান। স্ত্রী স্বামীকে আরও অধিক ভালোবাসিবে, যদি সে ভাবে--- স্বামী সাক্ষাৎ স্বয়ং ব্রহ্মস্বরুপ। স্বামীও স্ত্রীকে অধিক ভালোবাসিবে, যদি সে জানিতে পারে ---স্ত্রী স্বয়ং ব্রহ্মস্বরুপা। তিনিই স্ত্রীর মধ্যে,  তিনিই স্বামীতে বর্তমান। তোমার স্ত্রী থাকুক, তাহাতে ক্ষতি নাই। তাহাকে ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে হইবে, তাহার কোন অর্থ নাই, কিন্তু ঐ স্ত্রীর মধ্যে তোমার ঈশ্বর-দর্শন করিতে হইবে।
পুরুষ স্ত্রীকে এবং স্ত্রী পুরুষকে যে ভালোবাসার দ্বারা ক্রীত করিয়া থাকে, সেই ভালোবাসা ভগবানকে অর্পণ করিতে হইবে।

--স্বামী বিবেকানন্দ

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.